রবিবার ১৪ জুন ২০২৬ - ১০:৩৪
কাফিরের সঙ্গে সমঝোতা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কী?

কাফিরের সঙ্গে সমঝোতা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কী?

উস্তাদ আলী সাফায়ী হায়েরীর আলোচনার আলোকে

প্রয়াত ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষক উস্তাদ আলী সাফায়ী হায়েরী তাঁর গ্রন্থ "চোখ বন্ধ, ঝরনাধারা শুকিয়ে গেছে" (ফারসি: চশমহায়ে বাস্তে, চেশমেহায়ে কুর)-এ "কাফিরের সঙ্গে সমঝোতা" প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। তিনি সেখানে কুফরের প্রকৃতি, মুমিন ও কাফিরের আদর্শগত পার্থক্য এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কের সীমারেখা নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি : প্রয়াত ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষক উস্তাদ আলী সাফায়ী হায়েরী কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন,
• কাফিরদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত?
• তাদের সঙ্গে কি সমঝোতা করা যায়?
• তাদেরকে কি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যায়?
• তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বা স্বার্থভিত্তিক চুক্তি করা বৈধ কি না?
• চুক্তি কখন সম্পাদিত হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তা বাতিল করা যেতে পারে?
• সব অমুসলিমের সঙ্গে কি একই ধরনের আচরণ করা উচিত, নাকি তাদের অবস্থান, আচরণ ও মনোভাব অনুযায়ী পার্থক্য করা প্রয়োজন?

উস্তাদ সাফায়ী হায়েরীর মতে, এ বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল। কারণ, একদিকে শত্রুতা রয়েছে, অন্যদিকে অতি কঠোরতা কিংবা অযথা নমনীয়তা—উভয়ই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাসের সীমারেখা বিবেচনা করা জরুরি।

তিনি বলেন, মানুষের বাহ্যিক আচরণ কখনো কখনো একরকম মনে হতে পারে; কিন্তু তাদের চিন্তা, বিশ্বাস, উদ্দেশ্য ও জীবনদর্শন এক নাও হতে পারে। ফলে তাদের কর্মপদ্ধতি ও চূড়ান্ত লক্ষ্যও ভিন্ন হয়ে যায়। এ কারণেই কেবল বাহ্যিক সৌহার্দ্য বা পারস্পরিক সৌজন্য প্রকৃত আদর্শিক ঐক্যের প্রমাণ নয়।

উস্তাদ সাফায়ী হায়েরীর ব্যাখ্যায়, 'কুফর' বলতে এমন অবস্থাকে বোঝায়, যখন কেউ সত্যকে জেনে, বুঝে এবং তার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরও সচেতনভাবে তা অস্বীকার করে বা উপেক্ষা করে। এই অর্থে তিনি মনে করেন, মুমিন ও কাফিরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

তিনি লিখেছেন, "তুমি যা চাও এবং আল্লাহ যা চান, সে তা জানে; তবুও সে তা পদদলিত করে। এমন একজন সঙ্গীকে নিয়ে তুমি কোথায় পৌঁছাবে?"

তিনি আরও বলেন, "তুমি তার সঙ্গে চিন্তায়, পরিকল্পনায়, কর্মপদ্ধতিতে, কৌশলে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি নীতিতে সম্পূর্ণ সমন্বয় সাধন করতে পারবে না। তোমাদের মধ্যে কোনো মৌলিক মিল নেই—না ভিত্তিতে, না লক্ষ্যে।"

তাঁর মতে, এমনকি জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রেও মুমিন ও কাফিরের দৃষ্টিভঙ্গি এক নাও হতে পারে। কারণ, অন্যায়কে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের উদ্দেশ্য কী হবে, তা নির্ভর করে মানুষের বিশ্বাস ও আদর্শগত ভিত্তির ওপর। আর এই ভিত্তিগত পার্থক্য সংগ্রামের পরিকল্পনা, পদ্ধতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখযোগ্য। ইসলামী শিক্ষায় সব অমুসলিমকে একই দৃষ্টিতে দেখা হয় না। যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও মানবিক আচরণের নির্দেশ রয়েছে। অন্যদিকে যারা প্রকাশ্যে শত্রুতা, আগ্রাসন বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন ভিন্ন হতে পারে। তাই বিষয়টি ব্যক্তি, পরিস্থিতি এবং আচরণের আলোকে বিচার করতে হবে।

সুতরাং, উস্তাদ সাফায়ী হায়েরীর আলোচনার সারমর্ম হলো—সম্পর্ক ও সহযোগিতার প্রশ্নে কেবল বাহ্যিক স্বার্থ বা সাময়িক মিল নয়; বরং বিশ্বাস, মূল্যবোধ, লক্ষ্য ও নৈতিক ভিত্তির সামঞ্জস্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: প্রয়াত উস্তাদ আলী সাফায়ী হায়েরীর গ্রন্থ চোখ বন্ধ, ঝরনাধারা শুকিয়ে গেছে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha